পশ্চিমবঙ্গের এক রাজনৈতিক সমাবেশে খ্র্রীষ্টান
পাস্টর ও বিশপদের মঞ্চে দাঁড়ানোকে সরল
সৌজন্য বা আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির নিদর্শন বলে মেনে নেওয়া যায় না। এটি বরং এমন এক
দৃশ্য, যেখানে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার লোভ, পরিচয়ের রাজনীতি, আর নৈতিক অবস্থানের ধোঁয়াশা একসঙ্গে মিশে গেছে। যে জোটের
অদৃশ্য কিন্তু অনিবার্য ছায়ায় বিজেপি ও আরএসএস দাঁড়িয়ে আছে, সেই
জোটের মঞ্চে ধর্মীয় নেতাদের হাসিমুখে দাঁড়ানো—এটা অনেকের কাছে আত্মরক্ষা মনে হতে
পারে, কিন্তু সমান সংখ্যক মানুষের কাছে এটি আত্মসমর্পণ। কারণ, যে রাজনৈতিক জোটের কেন্দ্রীয় কাঠামোয় বিজেপি ও আরএসএস
অনিবার্যভাবে যুক্ত,
সেই জোটের রাজনৈতিক চরিত্র সমগ্র দেশকে ধর্মীয় মেরুকরণ, সন্দেহ এবং নির্বাচনী
লাভের রাজনীতিতে ঠেলে দিয়েছে—এ কথা নতুন করে প্রমাণের প্রয়োজন নেই। এমন একটি মঞ্চে
খ্র্রীষ্টান ধর্মগুরুদের উপস্থিতি তাই
স্বাভাবিক ধর্মীয় অংশগ্রহণ নয়;
বরং তা এক গভীর নৈতিক বিভ্রান্তি,
যার উত্তর পাওয়া দরকার।
প্রথম প্রশ্নটি সরাসরি: এই পাস্টর ও
বিশপরা কার প্রতিনিধিত্ব করছেন?
ওইসব খ্র্রীষ্টান নেতা কি সত্যিই
তাঁদের মন্ডলী, তাঁদের
বিশ্বাসী সমাজ, এবং
তাঁদের ধর্মীয় শৃঙ্খলার প্রতিনিধিত্ব করছেন?
তাঁদের অভিষেক, প্রশিক্ষণ, স্বীকৃতি এবং মন্ড্লীগত
শৃঙ্খলার বৈধতা কোথায়? নাকি
তাঁরা এমন এক পরিচয় নির্মাণ করছেন,
যা মাইক, ক্যামেরা, আর রাজনৈতিক
হাততালির ওপর দাঁড়িয়ে আছে?
যদি তাঁদের অভিষেক, প্রশিক্ষণ, বা
চার্চ-স্বীকৃতি স্পষ্ট না হয়,
তাহলে তাঁদের “পাস্টর” বা “বিশপ” পরিচয় জনপরিসরে আনা কতটা বৈধ—সেটিও
প্রশ্নসাপেক্ষ। যদি
তাঁরা সত্যিই প্রতিষ্ঠিত মন্ডলী-শৃঙ্খলার অধীনে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন, তাহলে তাঁদের
অবস্থান প্রকাশ্যে স্বচ্ছ হওয়া উচিত। আর যদি তাঁরা স্বঘোষিত নেতৃত্বের আড়ালে
রাজনৈতিক মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান,
তবে সেটি শুধু নৈতিকভাবে ভুল নয়,
বিশ্বাসভঙ্গের শামিল। ধর্মীয় পদবি শুধু একটি নাম নয়; তা
দায়িত্ব, শৃঙ্খলা, এবং জবাবদিহির দাবি
করে। সেই দাবি যদি না থাকে, তবে মঞ্চে দাঁড়ানোটা হয়ে যায়
একটি সাজানো অভিনয়। খ্রীষ্টীয় নেতৃত্ব
কোনো ব্যক্তিগত প্রচার-যন্ত্র নয়। এটি ক্ষমতার কাছে উপস্থিত হয়ে public recognition আদায়ের
মাধ্যমও নয়।
আরও উদ্বেগজনক হলো, এই উপস্থিতি কি
বিজেপি-শাসিত বা বিজেপি-প্রভাবিত রাজনৈতিক পরিসরের নিরাপদ আশ্রয় খোঁজার কৌশল? তাঁরা কি ক্ষমতার
নিরাপদ পাশে দাঁড়াতে চাইছেন?
? বিজেপি-শাসিত বা বিজেপি-প্রভাবিত শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করলে হয়তো
কিছু প্রশাসনিক সুবিধা, কিছু public visibility, কিছু
“সম্মান” পাওয়া যায়। কিন্তু সেই সম্মান কি সত্যিকারের, না কি ভয়ের আবরণে
পাওয়া সার্টিফিকেট? পশ্চিমবঙ্গসহ
দেশে যখন খ্র্রীষ্টানদের বিরুদ্ধে হামলা,
চার্চ ভাঙচুর, প্রার্থনায়
বাধা,সামাজিক নিপীড়নের এবং প্রশাসনিক
অসহযোগিতার অভিযোগ উঠছে, তখন কিছু
ধর্মীয় নেতা ক্ষমতাশালী শাসনের ছায়ায় দাঁড়িয়ে নিজেকে সুরক্ষিত করতে চাইছেন কি
না—এই প্রশ্ন অবধারিতভাবে ওঠে। যদি তাই হয়,
তবে তা নেতৃত্ব নয়; তা
সুবিধাবাদ। অভিযোগ উঠে আসে, তখন ক্ষমতার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু ধর্মীয়
নেতার ছবি এক ধরনের আত্মরক্ষার ছদ্মবেশ ছাড়া আর কিছু মনে হয় না।
এখানেই সবচেয়ে কুৎসিত সত্যটা সামনে
আসে। যে রাজনৈতিক জোটকে ঘিরে বারবার communal division, propaganda, এবং
ভোট-ধ্রুবীকরণের অভিযোগ উঠেছে, তার মঞ্চে দাঁড়িয়ে কোনো খ্র্রীষ্টান
নেতা যদি নিজের সম্প্রদায়ের পক্ষে কথা
বলেন, তবে সেটি তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন
তিনি একই সঙ্গে সেই জোটের বিভাজনমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধেও স্পষ্ট অবস্থান নেন।
কিন্তু যদি তিনি কেবল মঞ্চের সাজসজ্জা হয়ে থাকেন, তবে তিনি
সম্প্রদায়ের কণ্ঠ নন—তিনি প্রচারণার উপকরণ। আর সুবিধাবাদের ধর্মীয় রূপ সবচেয়ে বিপজ্জনক, কারণ তা বিশ্বাসীদের চোখে আধ্যাত্মিকতা হিসেবে ধরা পড়ে, অথচ ভিতরে থাকে
ভীতু সমঝোতা।
এই মঞ্চে “সংখ্যালঘু সুরক্ষা” বা
“সমতার” বুলি যতই উচ্চারিত হোক,
বাস্তবতা অন্য কথা বলে। বিজেপি-আরএসএস-ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ভাষ্য দীর্ঘদিন ধরেই
সমাজে বিভাজন, সন্দেহ এবং ধর্মীয়
উসকানিকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। যে রাজনৈতিক বাতাবরণ একটি দেশকে “আমরা” আর “ওরা”
ভাগে খণ্ডিত করে, সেই
পরিবেশে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় নেতার আশীর্বাদ দেওয়া মানে কেবল নিরীহ উপস্থিতি নয়—তা এক
ধরনের বৈধতা প্রদান। আর সেই বৈধতাই পরে প্রচারযন্ত্রে ব্যবহার হয়। মঞ্চে একজন
পাস্টর বা বিশপ থাকলেই যদি খ্র্রীষ্টান সমাজের সমর্থন বলে প্রচার করা যায়, তবে সেটি
প্রতারণার রাজনৈতিক কৌশল ছাড়া আর কী?
খ্র্রীষ্টান সমাজের পক্ষ থেকে এখানে আরও কঠোর জবাবদিহি দাবি
করা উচিত। এই লোকগুলো কারা? তাঁদের মন্ডলী কোথায়? তাঁদের অধ্যক্ষ কারা? তাঁদের ordination কোথা থেকে? তাঁদের training, accountability,
ecclesial discipline কোথায়? কোন মন্ডলী তাঁদের
এই ধরনের রাজনৈতিক মঞ্চে যাওয়ার অনুমোদন দিয়েছে? কোন সিনড, কোন ডায়োসিস, কোন ফেলোশিপ, কোন চার্চ
কাউন্সিল তাঁদের প্রতিনিধিত্ব স্বীকার করেছে?
নাকি তাঁরা কেবল ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ধর্মীয় পোশাকের মর্যাদাকে রাজনৈতিক
শোভায় পরিণত করছেন? নাকি
তাঁরা কেবল এমন কিছু স্বঘোষিত আধ্যাত্মিক মুখ, যারা ধর্মীয় পোশাককে
রাজনৈতিক পাসপোর্টে পরিণত করেছেন? আজকের দিনে ধর্মীয় পরিচয়
ব্যবহার করে ক্ষমতার টেবিলে জায়গা নেওয়া খুব সহজ। কঠিন হলো সেই পরিচয়ের নৈতিক
পরীক্ষা পাস করা। আর সেখানেই এইসব নেতার দুর্বলতা ধরা পড়ে। যে কেউ বাইবেল ধরে মঞ্চে উঠলেই তিনি যাজক হয়ে যান না। আর যে কেউ বিশপের পোশাক
পরলেই তাঁর নৈতিক কর্তৃত্ব জন্মায় না। নেতৃত্বের প্রথম শর্ত হলো বিশ্বাসযোগ্যতা।
আর বিশ্বাসযোগ্যতা আসে স্বচ্ছতা,
শৃঙ্খলা এবং
সত্যনিষ্ঠা থেকে।
সবচেয়ে কষ্টদায়ক বিষয় হলো, এই ধরনের
উপস্থিতি নিপীড়িত খ্র্রীষ্টানদের ক্ষতকে আরও জটিল করে তোলে। যারা চার্চ আক্রমণ, প্রার্থনায় বাধা, সামাজিক হেনস্তা, বা প্রশাসনিক
অবহেলার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে,
তারা রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা ধর্মীয় নেতাদের দেখে প্রশ্ন করবেই—তোমরা কি
সত্যিই আমাদের পক্ষে, না কি
ক্ষমতার কাছে নিজেদের পক্ষে?
এই প্রশ্নকে অবজ্ঞা করা যায় না। কারণ নিপীড়িত মানুষের কাছে নেতৃত্বের মানে
কেবল ভাষণ নয়; নেতৃত্বের
মানে সাহস, স্পষ্টতা এবং সত্যের পাশে
দাঁড়ানো। যাঁরা সত্যিই নিপীড়িত খ্র্রীষ্টানদের পাশে দাঁড়াতে চান, তাঁরা জনতার
সামনে ছবি তুলে নয়, নীরব
বিপদের সময়ে সাহস দেখিয়ে প্রমাণ দেবেন। তাঁরা ধর্মীয় স্বাধীনতা, উপাসনার অধিকার, এবং মন্ডলীর
নিরাপত্তার প্রশ্নে অনর্গল,
অদ্ভুত ভদ্রতা নয়—স্পষ্টতা দেখাবেন। কিন্তু মঞ্চে গিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে
হাত মেলানো, তারপর
“সম্প্রীতি” ও “ঐক্য”র বুলি আওড়ানো—এটা leadership
নয়; এটা packaging. আর একবার packaging শুরু হলে, faith-এর জায়গায় চলে
আসে branding।
এখানে একটি নীতিগত কথা বলা দরকার:
যদি কোনো ধর্মীয় নেতা সত্যিই সংখ্যালঘু অধিকার, উপাসনার স্বাধীনতা এবং আইনি সুরক্ষার জন্য রাজনৈতিক মঞ্চ ব্যবহার করেন, তবে তা তখনই
গ্রহণযোগ্য, যখন তিনি
একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন শক্তির বিভাজনমূলক চরিত্রের সমালোচনাও করেন। কিন্তু যদি তিনি
কেবল ছবি তোলেন, মঞ্চ ভাগ
করেন, আর ভাষণে
“ঐক্য” বলেন—তবে সেটি নৈতিক অবস্থান নয়;
সেটি রাজনৈতিক আলোকচিত্র। এবং ধর্মীয় নেতৃত্বকে আলোকচিত্রে সীমাবদ্ধ করা মানে বিশ্ব-খ্রীষ্ট মন্ডলীকে শূন্য প্রতীকে পরিণত করা। বিভাজনের
রাজনীতি যখন সমাজের ভিতরকার সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে, তখন
ধর্মীয় নেতার কাজ হওয়া উচিত সেই বিষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, না
যে-শক্তি বিষ ছড়াচ্ছে তার পাশে ছবি দেওয়া। কিন্তু এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে কিছু নেতা যেন
উল্টো বার্তা দিচ্ছেন—“আমরা আছি, আমাদের ভুল বুঝবেন না, আমাদের মেনে নিন।” কেন? কারণ হয়তো তাঁরা
বিশ্বাস করেন, বৃহৎ শক্তির পাশে থাকলে ছোট মানুষের নিরাপত্তা বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে অনেক সময়
তা ঘটে না। বরং এমন সম্পর্ক ধর্মীয় নেতৃত্বকে দুর্বল করে, আর
সাধারণ বিশ্বাসীদের চোখে তাঁদের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষয় করে।
সুতরাং, এখানে
সহানুভূতিশীল ব্যাখ্যা যতই দেওয়া হোক, প্রশ্নগুলো থেকে
মুক্তি নেই। এই উপস্থিতি কি নৈতিক সাহস, না সুবিধাবাদ?
এটি কি সম্প্রদায়ের স্বার্থে কৌশল, না ক্ষমতার
সঙ্গে নিরাপদ মিশে যাওয়ার চেষ্টা? এটি কি সত্যিকার
প্রতিনিধিত্ব, না public recognition-এর
ক্ষুধা? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এইসব
খ্র্রীষ্টান নেতা কি সত্যিই নিজেদের মন্ডলীর
সামনে জবাবদিহি করবেন, নাকি রাজনৈতিক মঞ্চের হর্ষধ্বনিতেই
নিজেদের পরিচয় বৈধ বলে ধরে নেবেন? অতএব, প্রশ্নের উত্তর
কঠোর হলেও স্পষ্ট: হ্যাঁ,
এই উপস্থিতি সন্দেহের জন্ম দেয়। হ্যাঁ,
এর মধ্যে public
recognition এবং রাজনৈতিক সুবিধা-অন্বেষণের গন্ধ আছে। হ্যাঁ, BJP-শাসিত বা BJP-প্রভাবিত
রাজনীতির নিরাপদ পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এবং হ্যাঁ, এইসব ধর্মীয়
নেতাদের পরিচয়, বৈধতা, প্রশিক্ষণ ও
প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। খ্র্রীষ্টান সমাজের উচিত আবেগ নয়, জবাবদিহি দাবি
করা।
যে সময় দেশ বিভাজনের রাজনীতিতে
ক্লান্ত, সে সময়ে
ধর্মীয় নেতৃত্বের কাজ হওয়া উচিত সত্যের পক্ষে, আক্রান্তদের পাশে এবং নৈতিক সাহসের সঙ্গে দাঁড়ানো। রাজনীতি যদি ধর্মকে
ব্যবহার করে, সেটি নতুন কিছু নয়। কিন্তু ধর্মীয় নেতৃত্ব যদি নিজেই রাজনীতির
সেবা করতে শুরু করে, তবে বিপদ আরও গভীর। তখন মঞ্চে থাকে
ধর্মের নাম, আর ভিতরে কাজ করে ক্ষমতার হিসাব। এটাই এই ঘটনার
সবচেয়ে বিস্ফোরক সত্য। ক্ষমতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা নয়। আর যদি কেউ সেটিকেই
নেতৃত্ব বলে চালাতে চান, তবে
তাঁদের নাম আধ্যাত্মিকতার ইতিহাসে নয়,
সুবিধাবাদের তালিকায় লেখা হবে।



